গা ছমছমের ভুতের গল্প

🌘 অতল রাতের প্রতিশ্রুতি — দীর্ঘ রহস্যগাঁথা (Part–1)

ভয়, স্মৃতি, প্রতিশ্রুতি আর অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া মানুষের গল্প…

শীতের শেষের হিমেল বাতাস যেন নীলডাঙা গ্রামের বুক থেকে ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছিল দিনের সমস্ত আলো। সন্ধের পর গ্রামটা অন্য রকম হয়ে যায়— কুয়াশার ধোঁয়া যেন গাছের ডালপালায় আটকে থাকে, আর মানুষগুলো নিজেদের ঘরে গুটিয়ে নেয়। এই গ্রামের একটাই অলিখিত নিয়ম— পূর্ণিমার রাতে কেউ সেতুর দিকে যায় না। কারণ সেখানে নাকি ডাক আসে।

ধানক্ষেতের ওপারে— যেখানে মানুষের শব্দ থেমে গেলে অন্ধকার কথা বলে।

শহর থেকে এসেছে ঋদ্ধি। শৈশবের একটা প্রতিশ্রুতি তাকে তাড়া করে ফিরছে বহুদিন। সে বলে বেড়ায়— “আমি লোককথার গবেষণা করছি।” কিন্তু সত্যিটা সে জানে— সে কারও কাছ থেকে পালিয়ে এসেছে। এমন কেউ— যে একদিন তাকে বলেছিল— “যদি দেরি করো, তবে আমিও যাবো।”

নীলডাঙার স্কুল শিক্ষক বিমলবাবু তাকে থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। লোকগল্প সংগ্রহের কাজে সাহায্যও করতে লাগলেন। কিন্তু বারবার একটা সতর্কবাণী শোনাতে ভুলতেন না— “সেতুর দিকে যাবেন না রাতে। ওইখানে সময়টা ঠিক মতো চলে না। সময় থেমে গেলে মানুষ পথ ভুলে যায়।”

পুরনো রেলসেতু— যেখানে পদধ্বনি নেই, তবুও শব্দের প্রতিধ্বনি শোনা যায়।

প্রথম রাত থেকেই অদ্ভুত ঘটনা শুরু হলো। রাতে বৃষ্টি ঝরছিল, টিনের চালের ওপর নরম শব্দ। হঠাৎ জানালা দিয়ে বাতাস ঢুকে এসে যেন খুব চেনা, অথচ অচেনা এক কণ্ঠে বলে উঠল— “ঋদ্ধি…”

সে চমকে উঠল। ঝড় নেই, বাতাস নেই, কেউ নেই… তবুও কণ্ঠ আছে। কাঁচের ওপর পাতলা ভাপ জমে আছে। ভাপের ওপর যেন আঙুল দিয়ে কেউ লিখে দিয়েছে— “তুমি দেরি করেছ।”

হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। সে হাত বাড়িয়ে কাঁচ মুছে দিল। লেখা মিলিয়ে গেল। কিন্তু একটা কাঁপুনি তার হাড়ে হাড়ে অনুভূত হলো। যেন শব্দটা ঢুকে বসেছে ভেতরে।

রাত্রির নদী— গভীরে যা থাকে তা আলোতে আসে না।

পরদিন ঋদ্ধি গ্রাম ঘুরতে বেরোল। বয়স্কদের কাছ থেকে লোকগল্প সংগ্রহ করতে গিয়ে একই গল্প বারবার শোনে— “একটা মেয়ে ছিল— মায়া। সে কারও অপেক্ষা করত। স্বপ্ন দেখত পালিয়ে যাবে। কিন্তু পূর্ণিমার রাতে সেতুর মাথায় গিয়ে আর ফিরে আসে নি।”

কারও মতে সে নদীতে নেমে গেছিল। কেউ বলে সে পালিয়ে গেছে। আবার কেউ ফিসফিস করে— “ও হারায়নি। ও অপেক্ষা হয়ে গেছে।”

রাতে আবার সেই ডাক— “ঋদ্ধি… সেতুর মাথায় এসো।”

সে সেতুর দিকে গেল। নদীর ওপর কুয়াশা থরে থরে জমে আছে। সেতুর গায়ে হিমের স্পর্শ। একসময় মাঝখানে দাঁড়াতেই কণ্ঠ চুপচাপ, গভীর হয়ে উঠল— “তুমি আমাকে খুঁজছো?”

ঋদ্ধির গলা শুকিয়ে গেল— “কে?” উত্তর— “যাকে তুমি ভুলে গেছ— অথচ সে তোমাকে ভুলেনি।”

দূরে দাঁড়িয়ে আছে এক মেয়ের সিলুয়েট— সাদা শাল, ভেজা চুল। মুখ দেখা যায় না। কিন্তু তার দেহভঙ্গি, কোমরের বাঁক, দাঁড়ানোর ভঙ্গি— সব যেন অদ্ভুতভাবে পরিচিত।

কুয়াশার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা ছায়া— যে হয়তো মানুষ, হয়তো স্মৃতি।

মেয়েটি বলল— “অপেক্ষা করলে ভয় জন্মায়। ভয় জন্মালে ডাক আসে। আর ডাক আসলে মানুষ নিজের ভেতরেই হারিয়ে যায়।”

ঋদ্ধি জানতে চাইল— “তুমি কি মায়া?” মেয়েটি বলল— “নাম দিয়ে কী হবে? মানুষের ভেতরের অপরাধবোধই নাম ধরে ডাকে।”

এই কথার পর কুয়াশা ঘন হয়ে গেল। মেয়েটি মিলিয়ে গেল। কিন্তু ঋদ্ধির মনে হলো— সে যেন কাউকে চিনত। কেউ, যে একদিন বলেছিল— “যেদিন সময় পাবে, সেদিন আর আমি থাকবো না।”

পরদিন বিমলবাবু এলেন। ঋদ্ধির মুখ শুকনো দেখেই জিজ্ঞেস করলেন— “সেতুতে গেলে?” সে কিছু বলল না। বিমলবাবু বললেন— “একটা কথা মনে রাখো— সেতুতে যে ডাক আসে— সেটা মানুষ শোনে না। শুনে তার নিজের ভেতরের ভয়।

কিন্তু ঋদ্ধি জানত— ভয় এভাবে কথা বলে না। ভয় লেখে না— "তুমি দেরি করেছ।" ভয় দাঁড়িয়ে থাকে না সাদা শালে। ভয় চোখ ভিজিয়ে তাকিয়ে থাকে না।

👉 গল্প এখানেই শেষ নয়। পরের অংশে ধীরে ধীরে খুলে যাবে— মায়া কে ছিল? আরিয়ান কেন আসেনি? আর ঋদ্ধি কেন মনে করল— মেয়েটি আসলে ঐশী?

❓ আজকের প্রশ্ন

আপনার মতে, সেতুর কাছে যে ডাক ঋদ্ধি শুনছে— সেটা কি সত্যি, নাকি তার নিজের ভেতরের ভয়?

Next Post Previous Post