গা ছমছমে ভূতের গল্প

কুয়াশা ও অরণ্য

🌌 “রাত্রির ত্রিকোণ” — স্মৃতি, অপেক্ষা আর এক মধ্যরাতের সত্য

একটা গ্রাম, এক নদী, এক সেতু— আর তিনজন মানুষের জড়িয়ে থাকা ভাগ্য।

শীতের শেষে কুয়াশা হঠাৎ ঘন হয়ে উঠল। উত্তর পাহাড় থেকে নেমে আসা ঠান্ডা বাতাস গ্রামটার চেনা রূপটাকে ধীরে ধীরে বদলে দিল। এই গ্রামটার নাম কমলডাঙা— পূর্বে ধানক্ষেত, পশ্চিমে নদী, দক্ষিণে পুরনো লোহার সেতু, আর উত্তরে শ্মশানঘাটের পাশে বটওদার গাছ। গ্রামের অলিখিত নিয়ম— সন্ধের পরে ওই দিক দিয়ে কেউ যায় না। লোকের বিশ্বাস, রাত নামলে সেখানে কথারা মুছে যায়, কিন্তু ডাক থেকে যায়— নাম ধরে।

ধানক্ষেতের ভোর
ধানক্ষেতের ওপারে, কুয়াশার নিচে, স্মৃতিগুলো হাঁটে নিঃশব্দে।

শহর থেকে এসেছে ঈশান— লোককথা আর স্মৃতি–মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করতে। কিন্তু সত্যি কথা, গবেষণার সাথে সাথে সে পালিয়ে এসেছে নিজের ভেতরের এড়িয়ে যাওয়া প্রশ্নগুলো থেকে। কমলডাঙার স্কুলশিক্ষক কমলেশ মজুমদার (সবাই কমলদা বলে) থাকার জায়গা দিলেন। সতর্ক করলেনও— “রাতে সেতুর দিকে যেও না, বাবা। ওইখানে সময়টা অন্যরকমভাবে বয়ে যায়।” ঈশান হেসে বলেছিল— “সময় ভুলে গেলে মানুষ লিখতে শেখে।” কমলদা নিঃশ্বাস ফেলে বলেছিলেন— “সময় ভুলে গেলে মানুষ ফিরে আসতে শেখে না।”

গ্রামের মানুষ বলে— বছর দশেক আগে পূর্ণিমার রাতে সেতুর মাথায় দাঁড়িয়ে মীনা নামে এক তরুণী অদৃশ্য হয়ে যায়। কেউ বলে আত্মহত্যা; কেউ বলে পলিয়ে যাওয়া; আবার অনেকেই ফিসফিস করে— “দেখেছিলাম, নাম ধরে তাকে কেউ ডেকে উঠেছিল।” ক’দিনেই ঈশান শুনতে পেল আরও টুকরো টুকরো কাহিনি: মীনার প্রেমিক আরিব, পালিয়ে যাওয়ার ঠিক আগে চিঠিটা নাকি পৌঁছয়নি; আর যে কণ্ঠ রাতের কুয়াশার ভেতরে নাম ধরে ডাকে, তা নাকি বাইরের নয়, ভিতরের

পুরনো সেতু
পুরনো লোহার সেতু— যেখানে কথারা মুছে যায়, কিন্তু রেলের লাইন মনে রাখে।

রাত গভীর হলে ঈশান কখনো জানালার ধারে, কখনো উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিল। কুয়াশা যখন চাঁদের আলোতে রুপোলি কাঁচের মতো হয়ে যায়, তখনই যেন বাতাস জমে উঠে ফিসফিস করে— “ঈশান…” কণ্ঠটা অকারণে চেনা। বুকের গভীর থেকে উঠে আসে এক ভুলে রাখা নাম— ঐশী। ঈশান হকচকিয়ে ওঠে; কণ্ঠ আবার বলে— “সেতুর মাথায় এসো।”

পরদিন সকালে কমলদাকে বলতেই তিনি চুপ করে তাকিয়ে থাকেন। “কে ডাকল?” প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ঈশান হেসে বলে— “সম্ভবত আমার মাথার ভ্রম।” কমলদা শান্ত গলায় বলেন— “কমলডাঙায় ভ্রমও কখনো কখনো সত্যির চেয়ে ভারি হয়।”

রাত্রির নদী
রাত্রির নদী— জলের ওপর ভাসে ধাতব আলো, গভীরে গোপন থাকে ছায়ার গমন।

দিন বাড়ে। ঈশান বয়স্কদের সাক্ষাৎকার নেয়, রেকর্ড করে। কেউ বলেন, “মীনা নদীতে নেমে গেছিল।” কেউ বলেন, “পশ্চিমে চলে গেছে।” আবার কারও বক্তব্য— “মীনা হারায়নি; মীনা অপেক্ষা হয়ে গেছে।” এই অপেক্ষারই নাকি আরেক নাম— “নিশি”; যে অপেক্ষা ভাঙে না, সে নাম ধরে ডাকে— ফিরিয়ে দিতে, বা ফিরিয়ে আনতে।

এক রাতে ঈশান সেতুর মাঝখানে দাঁড়ালো। নদীর ওপর কুয়াশা, নিচে কচ্ছপের মতো ভারি জল, দূরে ধানের গন্ধে মিশে থাকা শিউলির মিষ্টি। কণ্ঠটি স্পষ্ট হলো— “তুমি বিশ্বাস করো?” ঈশান বলল— “আমি জানতে চাই।” কণ্ঠ— “জানতে চাইলে শুনতে হবে— বাইরেরটাও, ভিতরেরটাও।” চারপাশে কেউ নেই; তবু বাতাস যেন কুয়াশার কাঁচে একটা মুখ এঁকে দেয়।

বাঁশঝাড়
বাঁশঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে, শব্দেরা ফিরে আসে অদৃশ্য পায়ের শব্দ হয়ে।

ঈশানের খাতা ভারি হয়। মীনার সঙ্গে আরিবের প্রথম দেখা, নদীর ঘাটে গোপন প্রতিশ্রুতি, আর পালানোর রাতের গল্প— সব লিখতে লিখতে সে বুঝতে পারে, নিজের ভিতরেও এক অক্ষয় অমীমাংসা জমে আছে। সে যখনই ঐশী-র নামের দিকে তাকায়, মনে হয়— কিছু অপূর্ণ রয়ে গেছে; কিছুর উত্তর পাওয়া হয়নি; কিংবা সে নিজেই শোনেনি

সন্ধে থেকে রাত, রাত থেকে আধো রাত। পুরনো রেললাইনের দিকে আলো জ্বলে ওঠে আবার নেভে। কমলদা বলেন— “এ গ্রামে ট্রেন বহুদিন ধরে চলে না; তবু লাইন রাত হলে টের পায় পায়ের শব্দ।” ঈশান এক রাতে শুনল— লোহার পাটাতনে কে যেন আস্তে আস্তে হাঁটে। চোখে দেখলো না; কানে এল পদধ্বনি; তারপর সেই কণ্ঠ— “ফিরে যা। বা—ফিরে আসো।” দু’টো শব্দ, দুই বিপরীত ফেরা— কোনটা কাকে বলা?

রাত্রির আলো
যে আলো দূর থেকে আসে, সেটাই অনেক সময় ভিতরের অন্ধকারকে চিনিয়ে দেয়।

এক দুপুরে ঘাটে দেখা হলো গ্রামের মেয়ে সুহানা-র সাথে। সে বলল— “আপনি যাকে খুঁজছেন, তিনি হয়তো মানুষ নন— একটা ক্ষত। ক্ষত যখন শুকোয় না, তখনই নাম ধরে ডাক শোনা যায়।” ঈশান হাসল— “তাহলে ডাক থামবে কী করে?” “ক্ষমা দিয়ে,” বলল সুহানা। “অথচ আমরা ক্ষমা চাইতে চাই না; আমরা প্রমাণ চাই।”

রাতে সেতুর গায়ে হাত রেখে ঈশান চোখ বন্ধ করল। মনে হলো, কণ্ঠটা এবার স্পষ্টতর— “আমি মীনা। কিন্তু আমি কেবল একজন নই; আমি যারা অপেক্ষা করতে করতে নিশি হয়ে যাই, তাদের সব কণ্ঠ। আমি যে ডাক শুনেছিলাম, সেটা বাইরে থেকে আসেনি; এসেছিল ভিতর থেকে— আমার নিজের ভয়ের গলা দিয়ে।” ঈশান বলল— “আরিব?” কণ্ঠ থেমে বলল— “সে ফিরেছিল— দেরিতে। আমি কি তাকে ক্ষমা করেছি? জানি না। তবে বুঝেছি— ভয় যত বাড়ে, কণ্ঠ তত গাঢ় হয়।”

ঈশান নোটবুকে লিখল— ভয় + অপেক্ষা = ডাক। এই সমীকরণটা যতবার লিখল, ততবার মনে হলো, “ঐশী”-র নামের পাশে ছোট্ট এক বিন্দু রেখে গেছে সে— যেদিন কথা শেষ হওয়ার আগেই কেটে দিয়েছিল কল। সেই বিন্দু থেকে এখনো রক্তের মতো কালি ঝরে। হয়তো ঐশী এখন অনেক দূরে; হয়তো কাছে, কিন্তু কথার বাইরে। তবু প্রশ্নটা থেকে যায়— ক্ষমা করা কি শেখা যায়?

বটগাছের ছায়া
বটের ছায়ায় অনেক নাম ঝুলে থাকে— ছাড়ে না, যতক্ষণ না ক্ষমা আসে।

গ্রামজুড়ে তখন ফুলঝুরি, উৎসব আসছে। কিন্তু পূর্ণিমার দিন যত কাছে আসে, গ্রামের লোকের চোখে তত এক ধরনের অনুচ্চারিত সন্ত্রাস। ঈশান লক্ষ্য করল— মানুষ যত বেশি কথা বলে, তত বেশি একটা কথা লুকিয়ে রাখে। সেই লুকোনো কথাটাই রাতে কণ্ঠ হয়ে ফিরে আসে— “ফিরে যা”— বা— “ফিরে আসো”। দু’রকম ফেরাতেই সমান টান।

পূর্ণিমার রাতে, ঈশান সেতুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে। দূরে নদীর জল সাদা; কাছে কুয়াশা ঘন। ঠিক তখনই— রেললাইনের ওপরে দূর থেকে ধাতব আলো ধড়ফড় করে এগিয়ে আসে। এই লাইনে ট্রেন বহুদিন চলে না— তবু আলো এগোয়, আর পাটাতনের ওপর পদধ্বনি। আলো থেমে যায়; আলো থেকে বেরিয়ে আসে সাদা শাল, ভেজা চুলে এক তরুণী। ঈশান মনে মনে নামটা বলে— মীনা

মীনা বলল— “ভয়কে তুমি কি দেখতে পাও?” ঈশান বলল— “শুধু শুনতে পাই।” মীনা— “শোনা আর দেখা আলাদা। ভয়কে দেখলে বুঝবে, সেটা কার কণ্ঠ ধার নিয়েছে। অনেক সময় আমরা যে শব্দে নিজের নাম শুনি, সেটা নিজেই বানাই— যাতে ফিরে যাওয়ার অজুহাত থাকে।”

ঈশান বলল— “তুমি কি ফিরে যেতে চাও?” মীনা হেসে বলল— “আমি ফিরতে চাই না; আমি চাই, মানুষ যেন আমাকে ভুলে যায়— আর নিজের ভেতরের ভয়কে চিনতে শেখে। আমি যদি গল্প হই, গল্পের কাজ শেষ হলে আমাকে রেখে দিও না।”

পুরনো রেললাইন
রেললাইন— কেউ আসে, কেউ যায়; ট্রেন না চললেও পদধ্বনি থামে না।

ভোর হতেই আলো মিলিয়ে গেল। ঈশান নিজের থিসিসের নাম ঠিক করল— “ভয়, স্মৃতি ও নিশির ডাক: কমলডাঙার কেসস্টাডি।” কিন্তু শেষে সে একটা বাক্য রেখে দিল— “যদি সবটাই বানানো হয়, তবে রাত হলে নদীর বাতাসে কে আমার নাম ধরে ডাকে?” প্রশ্নটা তার নিজের জন্য, আবার সবার জন্যও।

দিন গেলে দেখা গেল, যে প্রশ্নগুলো ঈশান অন্যদের করেছে, সেগুলোই ঘুরে এসে তাকে প্রশ্ন করছে— “তুমি কাকে ক্ষমা করতে ভয় পাচ্ছ?” “তুমি কেন নিজের গল্পের শেষ করতে পারো না?” “তুমি কি তোমার ভেতরের অন্ধকারকে নাম ধরে ডাকতে পারো?”— এই প্রশ্নগুলোর কোনোটার উত্তর সে লিখে না; কেবল খাতার প্রান্তে ছোট ছোট ডালিমফুল আঁকে।

একদিন দুপুরে কমলদা বললেন— “আরিব দুর্ঘটনায় মারা যায়নি, কিছুদিন শহরে ছিল। পরে সে এখানেও নাকি এসেছিল— খুব ভোরবেলা। কিন্তু সে কারও সাথে কথা বলেনি। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে নাকি ফিসফিস করেছিল— ‘ক্ষমা করো।’ কে শুনেছিল? কেউ নয়; সময়। সময়ই শুনে রেখেছে।” ঈশান ভাবল— সময়, কুয়াশা, নদী— এরা সবাই কি আমাদের বলা, না-বলা কথার সংরক্ষক?

সন্ধের পরে আজ আর কণ্ঠ আসেনি। ঈশান মনে মনে বলল— “ঐশী, আমি যদি কোনোদিন তোমায় আবার দেখি, প্রথমেই বলব— ভুল করেছি। তারপর জিজ্ঞেস করব— আমাকে কি ক্ষমা করবে?” কুয়াশা নিঃশব্দে নড়ল। কোথাও কোনো নিশি ডাকলো না। তবু তার মনে হলো— আজ রাতটা যেন একটু হালকা

শেষ নোট: কমলডাঙার গল্প শেষ হয় না। যে রাতে কুয়াশা নামে, সেতুর গায়ে দাঁড়িয়ে যদি তুমি নিজের নাম শুনে ফেলো— বুঝবে, সময় হয়েছে প্রশ্ন করার: “ডাকটা কার?” হয়তো উত্তর আসবে— “তুমিই।”

✍️ আপনার মতামত/উত্তর দিন

প্রশ্ন: “নিশির ডাক”— এটা কি সত্যিই বাইরের কোনো শক্তির কণ্ঠ, নাকি আমাদের ভিতরের অপরাধবোধ/অপেক্ষা/ভয়ের প্রতিধ্বনি, যা রাত হলে নাম ধরে ফিরে আসে? আপনার নিজের ভাষায় লিখে জানান— কোন মুহূর্তে আপনি ‘ডাক’ শুনেছেন বা মনে হয়েছে— আর সেই অনুভব আপনাকে কোথায় নিয়ে গেছে?

Next Post Previous Post