গা ছমছমে ভুতের গল্প
গ্রামটার নাম নীলডাঙা। দক্ষিণে কাদামাটির নদী, উত্তরে বটওদার মাঠ, পশ্চিমে পুরনো রেলসেতু, আর পূর্বে এক বিস্মৃত শ্মশান। এই গ্রামে একটা অলিখিত নিয়ম আছে— পূর্ণিমার রাত কাটে নীরবে। লোকেরা বলে, ওই রাতে “ডাকে”— তবে দূরের কেউ না, নিজেরই নাম।
ঋদ্ধি এসেছে শহর থেকে— গবেষণা, কিন্তু আসলে পালানো। পিছনে ফেলে এসেছে ভাঙা প্রতিশ্রুতি, এক শূন্য নাম— ঐশী। সে নিজেকে বোঝায়, “আমি লোককথার নথি করছি।” অথচ রাত নামলেই মনে হয়, কেউ যেন ফিসফিস করে বলে— “থেমো না, সামনে এসো।”
নীলডাঙার স্কুলশিক্ষক বিমলবাবু থাকার ব্যবস্থা করলেন। সতর্ক করলেনও— “রাত বারোটার পর সেতুর দিকে যেয়ো না, বাবা। ওইখানে সময় একটু ভুলে যায়।” ঋদ্ধি হাসল— “সময় ভুলে গেলে মানুষ লিখতে শেখে।” বিমলবাবু শুধু বললেন— “সময় ভুলে গেলে মানুষ ফিরে আসতে শেখে না।”
প্রথম রাত। হালকা কুয়াশা, টিনের চালের ওপর নরম বৃষ্টির শব্দ। ঘুম নামছে না। হঠাৎ জানালার ধারে বাতাস জমে উঠে ফিসফিস করে— “ঋদ্ধি…” সে চমকে ওঠে। কণ্ঠটা কেমন অকারণে চেনা। বুকের ভেতর হাঁটু জুড়ে বসে থাকা একটা নাম উঠে আসে— “ঐশী?”
কোনো উত্তর নেই। শুধু জানালার কাঁচে ঠান্ডা ভাপ, তাতে আঙুলের ছোঁয়ায় লেখা হয়ে যায়— “তুমি দেরি করেছ।” ঋদ্ধি কাঁচ মুছে দেয়, লেখা মিলিয়ে যায়। সেই রাতে সে বিলখে ওঠা কুকুরের ডাকে আবার শুনল— “সেতুর মাথায় এসো।”
পরদিন সকালে গ্রামে গল্প সংগ্রহ করতে শুরু করল। এক বুড়ি বললেন— “এই গ্রাম অপেক্ষা শিখিয়েছে। যে অপেক্ষা ভাঙে, সে ডাকে। নিশির ডাক আসে দূর থেকে না, ভেতর থেকে। শুনতে পাও যারা, তারা সবাই কোনো না কোনো অর্ধেক কথার মানুষ।”
বিমলবাবু বললেন— “একটা মেয়ে ছিল— মায়া। বছর সাতেক আগে পূর্ণিমার রাতে সেতুর মাথায় দাঁড়িয়ে কারও অপেক্ষা করছিল। ‘সে’ আসেনি। পরদিন থেকে কেউ মায়াকে দেখেনি। তারপর থেকেই, কুয়াশার রাতে অনেকে নিজের নাম শুনতে পায়।”
ঋদ্ধি রাত বারোটায় সেতুর কাছে গেল। নদীর ওপরে ধোঁয়ার মতো কুয়াশা। লোহার পাটাতনে পুরোনো শীতের কাঁপুনি। মাঝসেতুতে দাঁড়াতেই কণ্ঠ— “ফিরে এসো।” সে বলল— “কে?” কণ্ঠ— “তুমি যাকে ছেড়ে এসেছ।” সে চোখ বন্ধ করল। অন্ধকারের ভেতর দিয়ে একটা মুখ ভেসে ওঠে— ঐশী।
কিন্তু চোখ খুলতেই সে দেখে— সাদা শাল, ভিজে চুল, এক মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে দূরে। মুখ স্পষ্ট নয়। মেয়ে বলে— “তোমার মনে যা আছে, আমি তার ছায়া। যদি খুঁজতে এসেছ, শোন— অপেক্ষা যত বাড়ে, ডাক তত নিজেরই কণ্ঠ হয়।”
পরের ক’দিন ঋদ্ধি গ্রামের বয়স্কদের সাক্ষাৎকার নিল। কারও মতে মায়া নদীতে নেমেছিল; কারও মতে পালিয়ে গিয়েছিল; আবার অনেকে বলে— “মায়া হারায়নি, মায়া অপেক্ষা হয়ে গেছে।”
ঋদ্ধি রাতে ফিরে এসে নোটবুকে লিখতে বসে। লিখতে লিখতে বুঝতে পারে— নিজের ভিতরে যে ভয়টা, সেই ভয়ই কণ্ঠ হয়ে সেতুর ওপরে দাঁড়ায়। সে মনে মনে বলে— “ঐশী, তুমি কি সত্যি ছিলে, না আমি বানিয়েছি?” বাতাসে হালকা একটা হাসি— “সত্যি আর বানানো— দুটোই তো তুমি।”
এক সন্ধ্যায় বিমলবাবু পুরোনো কথা খুললেন— “মায়া অপেক্ষা করত এক জনের— আরিয়ান। শহর থেকে এসেছিল ছেলেটা। শিল্পী— লোকের ছবি আঁকত। ওরা পালাবে ঠিক করেছিল। কিন্তু সেদিন রাতে আরিয়ান আসেনি। কেন— সে উত্তর কেউ জানে না। মায়া আর সকাল দেখেনি।”
ঋদ্ধি জিজ্ঞেস করল— “আরিয়ান কোথায়?” বিমলবাবু বললেন— “নদীর ওপারের শহরে নাকি থাকত; তারপর হঠাৎ নিখোঁজ। কেউ বলে, সে ফিরেছিল— দেরিতে। আর অপেক্ষা দেরি সহ্য করে না।”
সেদিন রাতে সেতুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঋদ্ধি চোখ বন্ধ করল। কণ্ঠ এল— “তুমি কাকে খুঁজছ?” সে বলল— “যাকে আমি হারিয়েছি।” কণ্ঠ— “তাহলে কেন এখানে? তোমার হারানো তো সেতুতে ছিল না, তোমার ভেতরে ছিল।”
সে বুঝতে পারছিল, ভয়, ভালোবাসা, অপরাধবোধ— সব মিলিয়ে যে কণ্ঠ, সেটাই “নিশি”— বাইরে নয়, ভিতরের শব্দ। কিন্তু তবু, কেন যে দূরে দাঁড়ানো মেয়েটির চোখে জল লেগে থাকে? সে কি সত্যিই কেউ? নাকি ঋদ্ধিরই বানানো এক রূপ?
একদিন দুপুরে নদীর ঘাটে দেখা পেল সুহানা-র— গ্রামের এক তরুণী, যে নিজেও একদিন শহরে যেতে চেয়েছিল। সে বলল— “আপনি যাকে খুঁজছেন, তিনি হয়তো কেউ না। হয়তো আপনিই। নিজেকে খুঁজে পেলে, যে ডাক শোনেন— তা থেমে যাবে।”
ঋদ্ধি হাসল— “তাহলে গল্প থাকবে না।” সুহানা বলল— “গল্প থাকা না থাকা দিয়ে মানুষ বাঁচে না; মানুষ বাঁচে, যখন ক্ষমা করতে শেখে।” এই কথা শুনে ঋদ্ধির মনে অকারণে আরিয়ানের মুখ ভাসল— সে কি সত্যিই আসেনি? নাকি এসেছিল, কিন্তু সময় ভাঙা ছিল?
রাত বারোটার পরে, সেতুর গা দিয়ে একটুকরো হিম বাতাস বয়ে গেল। দূরে দাঁড়ানো মেয়ে বলল— “তুমি কি ক্ষমা করতে পারো?” ঋদ্ধি অবাক— “কাকে?” মেয়ে— “নিজেকে।”
এইখান থেকেই গল্প ঘন হয়— কারণ ক্ষমা চাইলে, ভয় মৃদু হয়; ভয় মৃদু হলে, ডাক ক্ষীণ হয়; আর ডাক ক্ষীণ হলে, মানুষ বুঝতে শেখে— সে একা নয়, সে নিজের সঙ্গে আছে।
চলবে… (Part–2-এ: মায়া-আরিয়ানের আসল ইতিহাস, ঐশীর অনুপস্থিতির সত্য, আর সেতুর রাতের শেষ মুখোমুখি)
❓ আজকের প্রশ্ন
‘নিশির ডাক’— বাইরে থেকে আসে, না ভিতর থেকে?