⭐ এক অপূর্ণ প্রতীক্ষা – অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্প ⭐

ভোরের প্রথম আলোটা আজ যেন একটু বেশি নরম। রিসা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। বাতাসের ছোঁয়ায় চুলগুলো মুখের ওপর এসে পড়ছে, কিন্তু তার চোখ যেন দূরে কোথাও কারও প্রতীক্ষায় ডুবে আছে। আজ ঠিক তিন বছর—মাহিন যায়নি, আসেনি, যোগাযোগও করেনি। তবুও রিসা অপেক্ষা করে… কোনো কারণ ছাড়াই।

রিসা ভাবে—*“যদি একদিন হঠাৎ ফিরে আসে? যদি একদিন বলে, ফিরে এসেছি…”* কিন্তু সে জানে, সব প্রতীক্ষার উত্তর থাকে না।

মাহিন আর রিসার পরিচয়টা ছিল খুব সাধারণ। একই ক্লাস, একই টেবিল, একই হাসি—কিন্তু অনুভূতির গভীরতা ছিল অসাধারণ। রিসা কোনোদিন মাহিনকে বলেনি, মাহিনও রিসাকে বলেনি। কিন্তু দু’জনই জানত—তারা দু'জন দু’জনকে ভালোবাসে।

একদিন কলেজে ফেরার পথে ঝুম বৃষ্টিতে বাস ভিজে থামছিল না। ছাতা ছিল না, তাই মাহিন নিজের গায়ে থাকা জ্যাকেট খুলে রিসার মাথায় ধরেছিল। রিসা বলেছিল— “রোগী হয়ে গেলে?” মাহিন হেসে বলেছিল— “তুমি থাকলে রোগও ভয় পায়।” সেই দিন রিসার মনে প্রথম প্রশ্ন জেগেছিল… *“এত যত্ন কি কোনো মানুষ অপরিচিতকে দেয়?”*

কিন্তু সেই হাসি, সেই যত্ন—সব যেন হঠাৎ একদিন থেমে গেল। মাহিন কোনো এক অজানা কারণে রিসার জীবন থেকে গায়েব হয়ে গেল। না বলা কথা, না পাওয়া উত্তর, না ফেলা অশ্রু—সবরাশিই থেকে গেল রিসার নিঃসঙ্গতার সাথী।

তবুও রিসা কখনো রাগ করেনি। কখনো ঘৃণা করেনি। কারণ ভালোবাসা যদি সত্যি হয়—ঘৃণা সেখানে থাকতে পারে না।

এদিকে মাহিন… তার গল্পটা কেউ জানত না। তার হারিয়ে যাওয়ার কারণটা কেউ জানত না। শুধু রিসার জন্য একটি ডায়রি লিখে রেখেছিল— যা রিসার হাতে পৌঁছায়নি কোনওদিন।

তিন বছর পর আজ হঠাৎ একটি অজানা নম্বর থেকে রিসার ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে নামটি দেখেই বুক কেঁপে উঠল— **“মাহিন”** ফোনটা ধরার পর অপর প্রান্তে শুধু একটা বাক্য— *“রিসা, আমি ফিরেছি… কথা আছে।”* আর কিছুই বললো না। ফোন কেটে গেল।

রিসার পুরো পৃথিবী যেন উল্টে গেল। এতদিনের প্রতীক্ষার উত্তর কি তবে আসছে? নাকি এ শুধু আরেকটা ভুল?

সেদিন সন্ধ্যায় রিসা ঠিক করলো, সে যাবে। যে উত্তর তিন বছর ঘুমাতে দেয়নি—সেটার মুখোমুখি দাঁড়াবে। হোক সে ভাল, হোক সে খারাপ— কিন্তু সত্যিটা জানতে হবে।

স্টেশন চত্বরে জনসমুদ্রের মাঝেও রিসার চোখ শুধু একজনকে খুঁজছিল। মাহিন কি সত্যিই এসেছে? নাকি এই প্রতীক্ষারও ব্যর্থতা আছে?

ঠিক তখন… রিসার সামনে দাঁড়াল মাহিন। ক্লান্ত, দুর্বল, কিন্তু চোখ দু’টো একই— ভালোবাসায় ভরা… অপরাধবোধে আক্রান্ত।

সে রিসার চোখে তাকিয়ে বলল— “আমি তোমাকে হারাতে চাইনি। আমি চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলাম… কারণ আমি অসুস্থ ছিলাম। চিকিৎসা না হলে বাঁচতাম না। তোমায় বলতে পারিনি… ভয় ছিল তুমি ভেঙে পরবে।”

রিসার চোখ দিয়ে অশ্রু নেমে এলো। কিন্তু আজকের অশ্রু প্রতিক্ষার নয়— পাওয়ার অশ্রু। আবারও হারানোর ভয় নেই, আজ শুধু কাছে থাকার সাহস।

মাহিন হাত বাড়িয়ে বলল— “চাইলে আমি চলে যাবো… কিন্তু যদি যেতে না বলো… আমি আর কখনও হারিয়ে যাবো না।”

রিসা ধীরে ধীরে সেই হাতটা ধরলো। বললো— **“হারিয়ে যাওয়ার অধিকার তোমাকে দিইনি। ফিরে আসার অধিকারও আমি দিইনি। তবুও তুমি আমার কাছে ফিরে এসেছ… এটাই যথেষ্ট।”**

সেদিন স্টেশনের ভিড়ের মাঝে দুইটা আত্মা আবার এক হল— অসমাপ্ত গল্পটা নতুন করে শুরু হলো। কিন্তু… **গল্পটা শেষ হলো না।** কারণ কিছু গল্প কখনো শেষ হয় না— শেষ হওয়া মানে যাকে ভালোবাসি তার শেষ হয়ে যাওয়া… আর ভালোবাসা কখনো শেষ হয় না।


আপনার মতামত / উত্তর লিখে সাবমিট করুন





Next Post Previous Post