শীত শেষের দিকে; তবু কমলডাঙার আকাশে কুয়াশা যেন নতুন বেড়া তোলে। উত্তর দিকের পাহাড় থেকে নামা বাতাস ধানগাছের মাথায় হালকা ঢেউ তুলে দেয়, আর সেই ঢেউ গ্রামবাসীর মনে পুরোনো কথাগুলোকে জাগিয়ে দেয়। এই গ্রামে সন্ধ্যার পর লোকজন সেতুর দিক এড়িয়ে চলে— বলে, “ওখানে রাত হলে সময় অন্যভাবে বইতে শুরু করে।”
শহর থেকে এসেছে ঈশান— লোককথা আর স্মৃতি-মনস্তত্ত্ব তার গবেষণার বিষয়। স্কুলের শিক্ষক কমলেশ মজুমদার (সবাই কমলদা) থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। প্রথমদিন রাতে তিনি বললেন, “সেতুর মাথায় ধাতব গন্ধটা কি কখনও টের পেয়েছ? রেল থেমে গেছে বহু বছর, তবু লাইন মনে রাখে পায়ের শব্দ।” ঈশান হেসে বলল, “শব্দ থাকে, স্মৃতিও থাকে; মানুষই ভুলে যায়।”
গ্রামের চায়ের দোকানে বসে ঈশান শুনল মীনার গল্প— দশ বছর আগে পূর্ণিমার রাতে সেতুর মাথা থেকে নাকি সে হারিয়ে যায়। কেউ বলে আত্মহত্যা; কেউ-বা বলে, পশ্চিমে পালিয়ে গিয়েছিল। আরেকদল বলে— “আমরা শুনেছি, নাম ধরে ডাকছিল কে যেন… ফিরতে নিষেধও করছিল।” গল্পের ভিতর গল্প, সত্যির ভিতর কোলাহল।
রাত বারোটার পরে প্রথমবার সেতুতে গিয়েই ঈশান শুনল এক কণ্ঠ— খুব নিচু, তবু স্বচ্ছ: “ঈশান…” সে থমকে দাঁড়াল। নদীর জল কালো কাঁচের মতো; কুয়াশা কাচে নিশ্বাসের দাগ তোলে। কণ্ঠ বলল— “তুমি জানো বিশ্বাস মানে কী? যে তোমাকে তোমার ভেতরের প্রশ্নের দিকে ঠেলে দেয়।” মানুষের কণ্ঠ, না নিজের মনে প্রতিধ্বনি? ঈশান বোঝে না। নোটবুক খুলে লিখে নেয়: “কণ্ঠের উৎস অদৃশ্য; তবু অর্থ ভাষার চেয়ে পুরোনো।”
দিনে দিনে সে মানুষের সাক্ষাৎকার নিতে থাকে— হরিডার, যিনি রেললাইন তুলে নেওয়ার কাজে ছিলেন; জবা পিসির, যিনি নাকি মীনার কাঁদা চোখ দেখেছিলেন শেষ বিকেলে; রইচ মিস্ত্রির, যিনি বললেন, “মেয়েটা হাল ছাড়েনি, দেরি হয়ে গেছিল শুধু।” আর ছিল আরিব— শহর থেকে এসে কয়েকমাস দোকানে কাজ নিয়েছিল, পরেই অদৃশ্য। কেউ বলে, সে এদিকেই ছিল; কেউ বলে, দুর্ঘটনা। গ্রাম মানে খবরের চেয়ে বেশি অনুমান, আর অনুমানের চেয়ে বেশি স্মৃতি।
তৃতীয় রাতে কণ্ঠ ফের এলো। “তুমি কি লিখে ফেলেছ আমাকে?”— ঈশান বলল, “তোমাকে নয়; তোমার চারপাশের নিস্তব্ধতাকে।” কণ্ঠ হেসে বলল, “নিস্তব্ধতারও তো বয়স হয়— আর বয়স হলে সে গল্প বলতে শেখে।” হঠাৎই বাতাসে আস্তে আস্তে ভেসে এল এক তরুণীর অবয়ব— সাদা শাল, ভেজা চুল, চোখে নদীর মতো গভীরতা। নাম না বললেও বোঝা যায়: **মীনা**।
“তুমি ফিরেছিলে?”— ঈশান জিজ্ঞেস করল। মীনা বলল, “আমি ফিরে গিয়েছিলাম— ভুল সময়ে। অপেক্ষা মানুষকে অন্যরকম করে দেয়; সে নিজের কণ্ঠকে ‘নিশি’ ভেবে ভয় পায়।” ঈশান বলল, “আরিব?”— মীনা মাথা নামাল, “সে এসেছিল— দেরিতে। কে যেন আমাদের নাম ধরে ডেকেছিল; হয়তো ভয়, হয়তো স্মৃতি।”
দিন গড়োয়। ঈশান দেখতে পায়— কমলডাঙায় কুসংস্কার মানে কেবল ভয় নয়; তা প্রজন্মের অপরাধবোধও। জবা পিসি একদিন ফিসফিস করে বললেন, “চিঠিটা সময়ে পৌঁছায়নি।” কারা আটকে দিয়েছিল— কথাটা ভাঙা কাচের মতো ঝলকে উঠে মিলিয়ে যায়। ঈশানের মনে প্রশ্ন বাড়ে— মানুষ কি সত্যিই অন্যকে হারায়, নাকি নিজেকে? মীনার হারানো কি গন্তব্য বদলের আরেক নাম?
শেষ রাতে— পূর্ণিমা। সেতুর মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে ঈশান নোটবুকে লিখছিল। দূরে, মৃত লাইনের উপর হঠাৎ আলো জ্বলে উঠল— যেন অদৃশ্য লোকোমোটিভ এগিয়ে আসছে। আলোটা থেমে গেল ঈশানের সামনে; আলো থেকে মীনা বেরিয়ে এল। বলল, “তুমি লেখো, কিন্তু একটা বাক্য রেখো নিজের জন্য— ‘ভয় যে নাম ধরে ডাকে, সেটা আমারই নাম।’” ঈশান বলল, “তোমার গল্প কোথায় শেষ?” মীনা হাসল, “যেখানে মানুষ আমাকে ভুলে যায়— আর নিজেকে মনে করে।”
শেষ নোট: কমলডাঙার গল্প শেষ হয় না। যে রাতে কুয়াশা নামে, সেতুর রেলিং ছুঁয়ে যদি নিজের নাম ধরে ডাক শোনো— প্রশ্ন করো: “তুমি কে?” হয়তো উত্তর আসবে— “তুমিই।”
❓ আজকের প্রশ্ন
“নিশির ডাক” আসলে কী? (একটি অপশন বেছে নিন)