শীতের শেষে হঠাৎই কুয়াশা ঘন হয়ে উঠেছে। উত্তর দিকের পাহাড় থেকে নেমে আসা বাতাস যেন গ্রামের চেনা রূপটাকে পাল্টে দিয়েছে। এই গ্রামটার নাম কমলডাঙা— পূর্বে ধানক্ষেত, পশ্চিমে নদী, দক্ষিণে পুরনো লোহার সেতু, আর উত্তরে শ্মশানঘাটের পাশে বটওদার গাছ। কেউই সন্ধের পর ওই দিক দিয়ে যায় না— কারণ, লোকের বিশ্বাস, সেখানে রাত নামলে শুধু ছায়ারা কথা বলে।
শহর থেকে গবেষণা করতে এসেছে ঈশান— লোককথা ও স্মৃতি–মনস্তত্ত্ব নিয়ে ওর কাজ। কমলডাঙার স্কুলের শিক্ষক কমলেশ মজুমদার (সবাই কমলদা বলে) থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন। বাড়তি সতর্কবাণীও দিলেন— “রাতে সেতুর দিকে যেও না, বাবা। ওইখানে সময়টা অন্যরকম বয়ে যায়।”
কিন্তু ঈশান কৌতূহলী। লোককথার পেছনে যে বাস্তব গল্প থাকে, সেটাই জানতে চায় সে। গ্রামের মানুষজন বলে— বছর দশেক আগে পূর্ণিমার রাতে সেতুর মাথায় দাঁড়িয়ে এক তরুণী— মীনা— অদৃশ্য হয়ে যায়। কেউ বলে আত্মহত্যা, কেউ বলে পলিয়ে যাওয়া; আবার কেউ ফিসফিস করে— “দেখেছিলাম, তাকে কেউ ডাকছিল নাম ধরে…”
ঈশান থাকে কমলদার বাড়ির আঙিনায় ছোট্ট ঘরে। রাত নামে। চারদিকে হালকা ধোঁয়ার মতো কুয়াশা। দূরে নদীর দিকে রেলব্রিজের ধাতব কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে। হাওয়ায় অদ্ভুত গন্ধ— শিউলি আর পাকা ধানের মিশ্র গন্ধ। ঠিক তখনই— “ঈশান…”— এমন এক কণ্ঠ, যা সে চেনে না, তবু অকারণে চেনা লাগে। সে চমকে ওঠে। জানালার বাইরে কেউ নেই। কণ্ঠ আবার বলে— “সেতুর মাথায় এসো।”
পরদিন কমলদাকে বলতেই তিনি থমকে গেলেন— “কে ডাকল বললে?” ঈশান হেসে উড়িয়ে দেয়— “সম্ভবত আমারই মাথার ভ্রম।” কমলদা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন— “কমলডাঙায় ভ্রমও কখনো কখনো সত্যির চেয়ে বেশি স্থায়ী হয়।”
রাত বারোটার পর ঈশান সেতুর দিকে যায়। নদীর ওপর হালকা কুয়াশা, নিচে অন্ধকার জল। সেতুর মাঝখানে দাঁড়াতেই কণ্ঠটা স্পষ্ট— “তুমি বিশ্বাস করো?” ঈশান বলে— “আমি জানতে চাই।” কণ্ঠ বলে— “জানতে হলে শুনতে হবে— নিজের ভিতরকেও।” কণ্ঠ যেখান থেকে আসে, সেখানে কোনো মানুষ দাঁড়িয়ে নেই। তবু হাওয়া যেন একখানা মুখ এঁকে দেয় কুয়াশার কাচে।
দিনগুলো কেটে যায়। ঈশান গ্রামের বয়স্কদের সাক্ষাৎকার নেয়, শোনে মীনার গল্প— প্রেম, বাধা, পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা, আর সেই রাতে নিখোঁজ হওয়া। মীনার প্রেমিক আরিব— যে নাকি শহর থেকে এসে গ্রামের ছোট দোকানে কাজ নিত। লোকজন বলে, আরিব বিশ্বাসঘাতক ছিল। কেউ বলে, সেতুর ওপর দুজনকে দেখেছিল; দুজনেই ছিলেন নীরব। তারপর শুধু এক কণ্ঠ শোনা যায়— “ফিরে যা।” কে বলেছিল? কেউ জানে না।
এক রাতে ঈশান সেতুর গায়ে হাত রেখে চোখ বন্ধ করল। কণ্ঠ আবার— “ঈশান…” সে বলল— “তুমি যদি মীনা হও, জানাও, কী হয়েছিল।” অনুনয়ের মতো, কণ্ঠ বলল— “আমি মীনা— কিন্তু আমার কোনো এক অংশ নদীতে থাকে, আরেক অংশ কথার মধ্যে। যাকে আমি ভালোবেসেছিলাম, সে ফিরেছিল— দেরিতে। যে ডাক শুনেছিলাম, সেটি আমার নিজেরই ভয়।”
ঈশান বুঝতে পারছিল, এই কণ্ঠ হয়তো তার নিজেরই বানানো কোনো মানসিক প্রতিধ্বনি। তবু কণ্ঠের ভিতরে থাকা মানুষের উষ্ণতা তাকে টানে। পরদিন কমলদা বললেন— “আরিব ঘটনাটার পর বছরখানেক এখানে ছিল। তারপর শহরে গিয়ে নাকি গাড়ি দুর্ঘটনায়… মানুষ কথা বলে।” ঈশান জিজ্ঞেস করল— “মীনা?” কমলদা তাকালেন সেতুর দিকে— “কেউ বলে, সে নদীতে নেমেছিল। কেউ বলে, পশ্চিমে চলে গেছে। কিন্তু পূর্ণিমায়, কুয়াশা যখন নামে, কণ্ঠটা থাকে।”
শেষ রাতে, ঈশান সেতুর মাঝ বরাবর দাঁড়িয়ে নোটবুকে লিখছিল। হঠাৎ রেলের লাইনে দূর থেকে আলো— কম্পমান। এ গ্রামে বহুদিন ট্রেন চলে না; লাইন মৃত। আলোটা আস্তে আস্তে কাছে এসে থমকে দাঁড়াল। আলো থেকে বেরিয়ে এল এক তরুণী— সাদা শাল, ভেজা চুল। ঈশানের মনে অকারণে এক নাম উঠল— মীনা। মেয়েটি বলল— “ভয় পেয়ো না। ভয় মানুষকে সময়ে আটকে রাখে। ভয়ই ডাকে— নাম ধরে।” ঈশান বলল— “তুমি কি ফিরে আসতে চাও?” মেয়েটি হেসে বলল— “আমি ফিরতে চাই না; আমি চাই, মানুষ যেন আমাকে ভুলে গিয়ে নিজের ভয়কে চিনতে শেখে।”
ভোর হতে হতে আলো মিলিয়ে গেল। ঈশান নোটবুক বন্ধ করল। তার থিসিসের নাম ঠিক হলো— “ভয়, স্মৃতি ও নিশির ডাক: কমলডাঙার কেসস্টাডি”। কিন্তু লেখার শেষে সে একটা বাক্য রাখল— “মীনা যদি কেবল গল্প হয়, তবে রাত হলে নদীর বাতাসে কে আমার নাম ধরে ডাকে?”
শেষ নোট: কমলডাঙার গল্প শেষ হয় না। যে রাতে কুয়াশা নামে, সেতুতে দাঁড়িয়ে যদি তুমি নিজের নাম ধরে ডাক শোনো— বুঝবে, ভয়কে জিজ্ঞেস করার সময় এসেছে: “তুমি কে?” হয়তো উত্তর আসবে— “তুমিই।”
✍️ আপনার মতামত/উত্তর দিন
আপনি কী মনে করেন— “নিশির ডাক” আসলে কী? (নিজের ভাষায় লিখুন)