কুয়াশাচ্ছন্ন গ্রাম

🌾 “নিশির ডালিমতলা” — গ্রামের ভূতের কিংবদন্তি

রহস্য, প্রেম আর শিহরন— এক রাতে বদলে যায় সমগ্র গ্রাম।

গ্রামটির নাম ছিল দেউলি— চারদিকে ধানক্ষেত, মাঝখানে বাঁশঝাড়, আর দক্ষিণে নদী। উত্তর সীমানায় একটা শ্মশান; তার পাশেই ডালিম গাছের ঘন ঝাড়— গ্রামের সকলেই সেই জায়গাটাকে বলে “ডালিমতলা”। অদ্ভুত এক নিয়ম ছিল: সন্ধ্যার পর কেউ ওই দিক দিয়ে যায় না। কারণ বহু বছর আগে পূর্ণিমার রাতে সেখানে নাকি “নিশি” ডাকে— নিজের জনের নাম ধরে। যে সাড়া দেয়, সে নাকি আর ফেরা পথ চেনে না…

বাঁশঝাড়ের পথ
বাঁশঝাড় পেরোলেই ডালিমতলা— যেখানে নিয়ম ভাঙে না কেউ।

শহর থেকে গবেষণা করতে এসেছিল ঈশান— লোককথা, ভূতের গল্প, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মিশ্র প্রভাব নিয়ে ওর থিসিস। দেউলির স্কুলের মাস্টার কমলবাবু থাকবার জায়গা করে দিলেন। প্রথম দিনই সতর্ক করে বলেছিলেন, “যতই পড়াশোনা করো, ডালিমতলা দিয়ে রাতের বেলা যেয়ো না বাবা।” ঈশান হেসে বলেছিল, “গল্প, কুসংস্কার!”

দ্বিতীয় রাতেই পূর্ণিমা। গ্রাম নিস্তব্ধ, কুকুরও ডাকে না। ঈশান কৌতূহলে টর্চ হাতে বাঁশঝাড়ের দিকে চলল। বাতাসে ডালিম-ফুলের ঘ্রাণ, বিচ্ছিরি ঠান্ডা। ঠিক তখনই— “ঈশান…”— ফিসফিস ডাক। কণ্ঠটা অদ্ভুত কোমল, যেন বহুদিনের চেনা। “কে?”— টর্চের আলো এদিক-ওদিক। জবাব নেই। আবার— “ঈশান, ওদিকটা দেখো…”

চাঁদের আলোয় নদী
চাঁদের আলোয় নদী— স্রোতে ভাসে গোপন স্মৃতি।

ডালিমতলার গাছের নিচে দাঁড়িয়ে এক মেয়ে— সাদা শাড়ি, খোলা চুল। চোখে যেন সমুদ্রের মতো গভীর জল। মেয়েটি বলল, “তুমি তো অবিশ্বাস করো না— বিশ্বাসও করো না। তাহলে এসেছো কেন?” ঈশান বলল, “আমি কেবল জানতে চাই— নিখোঁজের গল্পগুলো মিথ্যে, নাকি…” মেয়েটি মাথা নাড়ল, “সব গল্পই কারও সত্যি।”

সে নিজের নাম বলল— তুষ্টি। বলল, বহু বছর আগে ওকে এই ডালিমতলার কাছে শেষবার দেখা গিয়েছিল। জ্যাঠামশাই বিয়ে ঠিক করেছিলেন অন্যত্র; তুষ্টি ভালোবাসত পুবপাড়ার নবীনকে। পূর্ণিমার রাতে পালিয়ে যাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু নবীন আর আসেনি। তুষ্টি একা পৌঁছে গিয়েছিল শ্মশানপারের পুলে… তারপর?

ডালিমতলা
ডালিমতলা— যেখানে প্রতিটি ডালিমের ভেতর লুকিয়ে থাকে একেকটি কথা।

“লোকেরা বলে, তুমি হারিয়ে গিয়েছিলে,” ঈশান বলল। তুষ্টি হাসল, “হারানোর সংজ্ঞা কে দেবে? আমি তো আছি— যারা শোনে, তাদের কাছে।” ঈশান বুঝতে পারছিল না— মেয়ে কি মানুষ, স্মৃতি, নাকি কেবল চাঁদের ফাঁদ? তুষ্টি বলল, “তুমি জানতে এসেছ? তবে আমার কণ্ঠ লিখে নাও, না হলে ভুলে যাবে।” ঈশান নোটবুক খুলল। কণ্ঠটি যেন ধীরে ধীরে তাকে ভিতর থেকে টানতে লাগল।

সে জানল— নবীন রাত অবধি অপেক্ষা করেও তুষ্টির চিঠি পায়নি। চিঠি আটকে দিয়েছিল তুষ্টিরই জ্যাঠামশাই। তুষ্টি অপেক্ষা করতে করতে ডালিমতলায় এসে দাঁড়ায়, হঠাৎ নদীর ধারে শোনা যায় নবীনের নাম ধরে ডাক— “তুষ্টি…”— কণ্ঠটা যেন ওরই, অথচ নয়। তারপর— সাদা শাড়ির এক ফালি আঁধারে মিশে গেল।

ঈশান লিখতে লিখতে লক্ষ্য করল— সময় থেমে গেছে। গ্রামের কুকুর ডাকে না, ঝিঁঝিঁ পোকাও চুপ। শুধু ডালিম-ফুলের গন্ধ ভারী হয়ে উঠছে। তুষ্টি বলল, “নিশি কাকে ডাকে জানো? যে সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা করেছে— তাকে।” “তাহলে তুমি?” “আমি অপেক্ষা করে গেছি; তাই আমিই ডাকি— নিজেকেই।”

ভোরে গ্রাম জেগে ওঠার শব্দ শোনা গেল। তুষ্টি বলল, “যাবে? থাকলে তোমাকেও মনে থাকবে না কেউ— শুধু ডালিম-ফুল মনে রাখবে।” ঈশান টলতে টলতে ফিরল। কমলবাবু বললেন, “রাতে গিয়েছিলে?” ঈশান নীরব। মাস্টারমশাই ধীরস্বরে বললেন, “তুষ্টি সত্যি হারায়নি। লোকটা— জ্যাঠামশাই— পরে স্বীকারও করেছিল চিঠি আটকে দিয়েছিল। নবীনও মরেনি; সে সন্ন্যাস নিয়ে চলে যায়। এই দুঃখটাই ‘নিশি’ হয়ে কাঁদে।”

শ্মশানপারের পথ
শ্মশানপারের পথে, গল্পেরা জেগে থাকে— মানুষ ঘুমোলেও।

শেষ রাতে ঈশান আবার ডালিমতলায় গেল— এবার কেবল একবার শোনার জন্য। “তুষ্টি…”— নিজের অজান্তেই ডাকল। ঝাড় কেঁপে উঠল। ফিসফিসে উত্তর এল, “অপেক্ষা করো না। অপেক্ষা যত বাড়ে, ততই নিশি বড় হয়।” বাতাসে ডালিমফুল ঝরে পড়ল— যেন রক্ত-রঙা কুয়াশা। ঈশান নোটবুক বন্ধ করে মাথা নোয়াল। ভোরের আগে সে গ্রাম ছাড়ল।

বহু বছর পর ঈশানের বই প্রকাশিত হলো— “নিশির ডালিমতলা: এক গ্রামের সামষ্টিক স্মৃতি”। গবেষকরা বললেন— এটা ট্রমার কাহিনি। কিন্তু ঈশান বইয়ের শেষে এক লাইন লিখল: “ডালিমতলায় দাঁড়ানো মেয়েটি, যদি তুমি কেবল স্মৃতি হও— তবে কেন ডালিমফুল এখনো সেই রাতে ঝরে পড়ে?”

❓ এখন প্রশ্ন

ডালিমতলার “নিশি” আসলে কী?

Next Post Previous Post